Showing posts with label লাইফস্টাইল. Show all posts
Showing posts with label লাইফস্টাইল. Show all posts

Saturday, July 15, 2017

অন্তরা কর ও অপরাজিতা সেন


শিকড় সন্ধান দেশে বিদেশে
অন্তরা কর ও অপরাজিতা সেন


সাউথসিটি, কলকাতা

একটি অতিকায় মুদিখানা দোকানের (রিটেল শপ) এক নিভৃত কোণায় মন দিয়ে লো ফ্যাট বিস্কুটের গুনাগুন পড়ছি, কানে এল ঐতিহাসিক কথোপকথন :

সারাদিন হাইজিন হাইজিন কোরো না তো - এই তো দেশে   এলাম কটা মাসের জন্য- একটু রুট টা ফিল করতে দাও। বেশ জমিয়ে কটাদিন পোস্ত সর্ষেবাটা খাব, সেই মা বানাতো ছোটবেলা- উফ্ গরম ভাতে কি অসাধারন।

(বিরক্তিসূচক শব্দ) তোমার রুট ফিল করতে গিয়ে সেবার দুদিন ORS খেয়ে কাটাতে হল। কি যে হয় না তোমার- আসছো তো বছর বছর - কি যে তোমাদের আদিখ্যেতা রুট নিয়ে । দেশে পা দিতেই হা হা করে আনহাইজিনিক খাবারগুলো খাবে আর পাঁচশ বার দেখা কলকাতা চষবে। তাতেও মন ভরবেনা।  ফেরার সময় সারা ফ্লাইট প্যানপ্যানে মুখ করে থাকবে- অসহ্য বাতিক তোমাদের।

কৌতুহল চাপতে না পেরে উঁকি দিলাম। শিকড়বাবু যারপরনাই NRI- পরেন বারমুডা ও নাইকী জুতো, হাতের আঙুলে গোমেদ ও পলা, জামায় ঝুলন্ত রে ব্যান, হাতে পিকসেলের আনকোরা মডেল। মিসেস বেশ পরিপাটি, বিলাসিনী । শিকড়বাবুর উপর যথেষ্ট বিরূপ। আরো শুনব বলে পিছু নিলাম ।

হুঁ হুঁ বাওয়া বুঝবে না। তুমি রায়পুরের প্রবাসী, দেশের টান তুমি কি বুঝবে? নর্থ ক্যালকাটার রুট টা অনেক ডীপ ..

(নাক টেনে) হ্যাঁ, সারাজীবন তো ঐ পিছনে বাঁশ আর বগলে ইতিহাস বয়ে বেড়ালে...
 (একগাল হেসে) – ‘এটা "বুনোহাঁস" এর ডায়লগ ..

‘I found it so true .. honestly - am sick of this root stuff of yours’

‘Relax. আরে তুমি তো জানো , কলকাতায় আসলেই কেমন যেন সব nostalgic লাগে। মনে হয় মার হাতের রান্না খাই, দেবুদের সাথে হেদুয়ার আড্ডা, গোলবাড়ির কষা মাংস , কফি হাউসের কাটলেট - একটা ব্যাপার আছে জানো...

জানার আগেই মিসেস এগিয়ে গেলেন বিলিং এর দিকে।

আমার মাথায় ঘুরছিল এই শিকড়বাবুর কথা। অনেকদিন বাইরে থাকলে দেশের জিনিস অন্যরকম লাগে, যে সব অসুবিধাকে শাপশাপান্ত করতে করতে একদিন দেশ ছাড়া, সেগুলোই স্মৃতিচারনে নতুন করে পাবার স্পৃহা নিয়ে ফিরে আসে। মায়ের হাতের ডাল-ভাত একদিন অখাদ্য মনে হত, আজ সেটা পেতেই হেদিয়ে মরা - এটাই কি শিকড়ের টান ?

আমার জন্ম -ধর্ম-কর্ম সবই কলকাতা, না দেখেছি দেশভাগ, না বুঝেছি পরবাস। এহেন নিশ্চিন্ত নিরীহ জীবনযাপনে শিকড়রের টান অনুধাবন করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। কিন্তু যতবার ভেবেছি ততবার মনে হয়েছে বিলেতে বসে মোচার ঘন্ট খাওয়ার আকাঙ্খার থেকে শিকড়ের টান প্রতিপন্ন হয়না। শুধু nostalgia র সার্ফিং বোর্ড চড়ে যখন তখন শিকড়ের টানে ডাইভ মারলে প্রবাসী হওয়া সার্থক হয়না। এর মানে আরও গভীর। মানুষ তো কখনও গাছ হতে চায়না- গমন তার অহংকার, গতি তার জীবনের পূর্ণতা আনে- তবে কেন শিকড় নিয়ে এত টানাটানি। বুদ্ধিজীবীরা বলে মানবজাতির উত্থান নাকি ঐ শিকড়ের ভিতর - বাবা রামদেব ও তাই উঠে পড়ে লেগেছে সব শিকড়কে নিংড়ে সব উত্থান বোতলবন্দী করতে। এই অধরা অনুভূতিকে সামনে রেখে বানিজ্যিক ভাবে সব টান উসকে দেবার ব্যবস্থাও দেদার। বঙ্গ থেকে বঙ্গ সম্মেলন উঠে গিয়ে পড়ল পশ্চিমের সাগরপাড়ে। সেখানে আগে দূর্গাপুজো হত শুধু - এখন শিতলা, সত্যনারায়ন, ইতু সব পালন। টান উঠলেই অনলাইনে সব হাতের মুঠোয়। সত্যি সত্যি কজন ভাবে নিজেদের রুটস নিয়ে? মন থেকে কজন ফিরে আসতে চায়?হাতের কমফর্ট পায়ে ঠেলেনিজের সাধ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে চলে আসতে পারে?

প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা।

বিদেশে

‘Mom, can I go out tonight, please? I have finished all my homework’

চোখ তুলে দেখি মেয়ে বাইরে যাবার জন্য একদম তৈরী। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সাজ সম্পূর্ণ। চোখের পাতায় ঘন মাসকারা, ঠোটে ঘন লিপস্টিক| জামাটার কথা আর নাই বা বললাম| কতক্ষণ ধরে সাজ হচ্ছে কে জানে| হোমওয়ার্কই বা শেষ হল কি করে ! হাতে নতূন পূজোবার্ষিকিটা এসেছে আজ। তাই তেমন মন দিতে পারিনি অন্যদিকে। কটমট করে তাকাই মেয়ের দিকে।
কাল তোমার স্কুল আছে না? এখন আটটা বাজে। এখন বেরিয়ে কখন ফিরবে শুনি? আর এই সাজে বাইরে যাবে? এই জামাটা এলো কোথা থেকে?
 ‘Mom, I’m not a kid anymore.’
 ‘বাঙলায় কথা বল। বলেছি না বাড়িতে ইংরিজি বলবে না আমার সাথে? না কি আজকাল খুব অসুবিধা হয় বাঙলা বলতে?’
‘Ma, cut it out. বাঙলা বলতে গেলে তো একটু ভাবতেই হয়। I don’t have so much time. যাব কি না বল
না যাবে না। কার জামা পড়েছ বললে না?’
‘Uffff, Nita lent it to me. I really dig this dress, Ma. Please let me go.’
যতদিন এখানে আছ ততদিন বাড়ির নিয়ম মেনে চলতে হবে তিতির। বাবা কি বলবেন একবার ভেবে দেখেছ? এই রকম সাজ পোষাক করতে শিখলে কিভাবে কে জানে। একদম একটা চেড়ির মত দেখাছ্ছে। যাও হাত মুখ ধুয়ে এখানে এসে বসো। একটা মজার গল্প শোনো…’
‘Baba will not say a thing. He is not like you. You can be really horrible, Ma.’

বিষদৃষ্টিতে আমাকে প্রায় ভস্ম করে দিয়ে মেয়ে বেরিয়ে গেল ঝড়ের মত। দড়াম করে তার ঘরের দরজা বন্ধ হল। দরজার কাছে গিয়ে শুনি মেয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সাহস পেলাম না বিরক্ত করার।

মনটা খারাপ হয়ে গেল। মেয়ে কাঁদলে কোন মারই বা ভাল লাগে ? কিন্তু এখন নরম হলে চলবে না। তিতির বিদেশে জন্মেছে, বড় হয়েছে সবই ঠিক। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেছি যাতে আমার ছেলে মেয়ে নিজেদের শিকড় ভুলে না যায়। ওরা যতদিন ছোট ছিল ততদিন সব কিছু ঠিকঠাক ছিল। তিতির বাংলা গল্প শুনতে ভালবাসত। টুনটুনির বই আর আবলতাবল মুখস্থ ছিল ওর। বাঙলা গান গাইত নিজের মনে। ওকে বাঙলা পড়তে আর লিখতেও শিখিয়েছিলাম। আমার ছেলে কাটুমকেও। সব ভুলে গেছে দুজনেই। এখন তাদের বাঙলা বলতেও কষ্ট হয়।

জানালার বাইরে রাত গভীর হছ্ছে। রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ কমে আসছে। আমাদের ছোট্ট বাড়িতে প্রায় কোন শব্দ নেই। প্রাণেশ কখন ফিরবে কে জানে। আজকাল প্রায়ই ফিরতে দেরী হয় তার অফিসে নাকি অনেক কাজ। আজ বলেছিলাম ফারুকের দোকানে যেতে অনেকদিন পাঁঠার মাংস আসেনা বাড়িতে। যাবে কিনা কে জানে? সোমাদের নেমন্তন্ন করেছি শনিবার। মেয়েটা পাঁঠার মাংস বড় ভালবাসে….

অন্যমনস্ক ভাবে CD playerটা চালিয়ে দিই। রাজেশ্বরী দত্তর গলায় বেজে ওঠে এ পরবাসে রবে কেমনে পড়ে গেল গতকাল এই গানটা শুনছিলাম মন দিয়ে। অম্লান বার বার করে অনুরোধ করেছে ওদের নাটকের জন্য গান বেছে দিতে। বলেছিল স্ক্রিপ্টটাও একটু দেখে দিতে। ওর নাকি এখন বাঙলা লিখতে একটু অসুবিধা হয়। বানান ঠিক থাকে না, সাধারণ ইংরিজি কথাগুলোর বাঙলা অনুবাদ মনে পড়ে না চট করে।
নাটকের সংলাপ তো আর বেনারসির মত ভারি হলে চলবে না? ফুরফুরে জামদানী চাই। তুমি একটু দেখে দাও।
তা কেন অম্লান? এই তো বেশ ঝরঝরে বাঙলা বলছ। জামদানী আর বেনারসি? এ তো অমিত রায়ের মত কথা!
লজ্জিত হেসে বলেছিল মনে তো সবই আছে দিদি। এখনো সময় পেলেই রবীন্দ্র রচনাবলি খুলে বসি। কিন্তু বেচাকেনা করতে করতেই দিন কেটে যায়। বাকি সময় নাটক নিয়ে পড়ে থাকি। ভাগ্যিস কিছু লোক এখনও আছে আমার সাথে!

ওদের গতবছরের নাটকের কথা মনে পড়ে যায়। শীর্ষেন্দুর একটা গল্পভিত্তিক নাটক। অম্লান আর ওর বৌ মিতা লিখেছিল তার স্ক্রিপ্ট। অভিনয়ও বেশ ভাল হয়েছিল। বিজয়া দশমীর পর নাটক। আসেপাশে, এমনকি অনেক দূর থেকেও বাঙালিরা এসেছিল। বেশ একটা মেলার মত ব্যাপার। নাটকের শেষে বাইরে এসেছি চা খাব বলে। পাশে বেশ একটা বড় দল আড্ডা মারছে। বয়স কম এদের সবই প্রায় অচেনা মুখ। টুকরো টুকরো আলোচনা কানে ভেসে আসে
কেমন লাগল নাটক তোমাদের? বেশ ভাল হয়েছে, তাই না?’
হ্যাঁ, মন্দ না। তবে কি জানেন, আমার কিন্তু হালকা নাটক বেশী ভাল লাগে। এই সব একাকিত্ব, টানাপোড়েন, existentialism – বড় বেশী গম্ভীর।
ঠিক বলেছ মৌ। বেশ জমজমাট একটা নাটক, বেশ ধুমধাড়াক্কা, নাচ গান থাকবে, আমরা প্রাণ ভরে হাসব আরে এখানে তো আমরা মজা করতে এসেছি তাই না?’
যাই বল, আমার কিন্তু ভাল লেগেছে
আরে ভাই, তুই কলেজস্ট্রিটির আঁতেল। তোর তো ভাল লাগবেই। আমরা অত বুঝিনা
গত বছরের নাটকটা বরং এর থেকে অনেক ভাল ছিল। আমার ছেলেমেয়ে তো বাঙলা বোঝেই না। কিন্তু ওরাও খুব এনযয় করেছিল।
গত বছর তো শুভ্ররা নাটক নামিয়েছিল। কই ওদের তো দেখলাম না আজ?’
আমি তো শুনলাম ওরা আলাদা একটা দল করেছে। নাটক করবে না আর। ওরা নাকি এখন থেকে শুধু নাচ গানের প্রোগ্রাম করবে।
ও মা, তাই নাকি? ওরা তো সব গলায় গলায় বন্ধু। এখন বুঝি মুখ দেখাদেখি বন্ধ?’
অতো জানি না তবে হতেই পারে। বাঙালিদের তো এই স্বভাব। সবার এতো ইগো…’
আরে আমি তো তাই বলি খানাপিনা মস্তি করো। এইসব গঠনমূলক কাজ করতে গেলেই যত ঝামেলা।। চাঁদা দেব, পূজোতে যাব, ফাংসন দেখব এই হোলো আমার attitudeফেল কড়ি মাখো তেল…’
আমি সন্তর্পণে চায়ের কাপ নিয়ে ওখান থেকে সরে গিয়েছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে মনে পড়ে গিয়েছিল কাকামণির হেরে যাওয়া মুখ। আমাদের পাড়ার বনেদি পূজোটা যেদিন দুভাগ হয়ে গেল। আর তারপর ভাঙতে ভাঙতে শেষ হয়ে গেল একদিন।

দরজায় চাবির শব্দে তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম। প্রাণেশ দুহাতে দুটো বিরাট ব্যাগ নিয়ে ঢুকে।
কিগো, অন্ধকারে ভূতের মত বসে আছ কেন? , গান শুনছো? তা আলোগুলো জ্বালিয়ে নিলেই পারো? আমি তো ভাবলাম বাড়িতে কেউ নেই
আমি ওর হাত থেকে ব্যাগদুটো নিই।
কি এনেছ এতো? আমি তো ভাবছি তোমার এত দেরী হছ্ছে কেন।
আরে সুমি, আজ দারুণ বাজার করেছি, বুঝলে! ফারুকের দোকনে তো গেলাম আগে। সে জানালো রাজুর দোকানে আজ টাটকা চালান এসেছে। মাছ আর তরিতরকারি। চলে গেলাম সেখানে। দেখ কত কিছু এনেছি। বেশ জমিয়ে রান্না কর কদিন। এক বোতল সর্ষের তেলও এনেছি। কি জানি তোমার ভাণ্ডারে আছে কি না?’

আমি ব্যাগ খালি করতে তাড়াতাড়ি যাই রান্নাঘরে। প্রাণেশ একটা বিয়ার নিয়ে জমিয়ে বসে সোফাতে। টিভিটা চালিয়ে দিয়ে বলে স্যামি কই? দেখছি না তো? বেরিয়েছে নাকি?’
ওর নাম সম্পূর্ণা। তুমিও কি ভুলে গেলে? কত শখ করে তোমার বাবা ওর নাম দিয়েছিলেন মনে পড়ে? নয়তো তিতির বল। স্যামি আবার কি নাম?’
উঃ আবার শুরু করলে তো! সব কথায় এত খুঁত ধরো কেন? ওকে তো সবাই স্যামি বলে ডাকে। নীলও ডাকে তো!
নীলান্জন নীল হয়েছে এখানে। মন্দের ভাল। তাই বলে স্যামি?
আছ্ছা ঠিক আছে। মানলাম। কিন্তু সে কোথায়?’
নিজের ঘরে শুয়ে আছে। বেরোতে বারণ করেছি তাই।
তুমি বড় uncompromising, সুমি। আমরা কি এখন দেশে আছি নাকি? কেন বোঝো না আমাদের ছেলেমেয়েরা এখানে জন্মেছে, এখানে বড় হয়েছে। আমাদের মত দম বন্ধ করা শাসনের অচলায়তনে বড় হয়নি তো? এই সেদিন Roxanne-র ছবি নিয়ে কি অশান্তিই না করলে….’
ওর নাম রূকসানাদাঁতে দাঁত চেপে বলি। আমিনা আমাকে ফোন করে কত কাঁদল সেদিনজানো, ওদের সমাজে মেয়েটাকে নিয়ে ঢি ঢি পড়ে গেছে?’

ওদের সমাজ ঐ রকমই, সুমি। মধ্যযুগ থেকে এখনো বেরোতে পারলো না। তা বলে তুমিও তাই করবে নাকি? আর কবে বদলাবে সুমি? পঁচিশ বছর তো হয়ে গেল। এখনও ঐ ফালতু বাঙালিয়ানা ছাড়তে পারলে না? এখনও স্বপ্ন দেখ তোমার বাঙালি বৌ আর জামাই হবে। কি তোমার এত টান? থাকতে পারবে কলকাতায় এখন? পারবে না। ছেলেটা তো কবে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। মেয়েটাকেও তাড়াতে চাও? কেমন মা তুমি সুমি? দাঁড়াও আমি গিয়ে দেখি মেয়েটা কি করছে।

কান্না চেপে ব্যাগ নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকি। প্রাণেশ আজ সত্যি অনেক বাজার রেছে। কাঁচকলা, মোচা, পালং শাক, ঢ্যাড়স, ঝিঙে, কাঁচা লঙ্কা আর নারকোল একটা ব্যাগে। অন্য ব্যাগটাতে রুই, ভেটকি আর ইলিশ মাছ, পাঁঠার মাংস, শর্ষের তেল, পোস্ত, চানাচুর, ফুচকার খোল আরো কত কি। দুদিনের পর তিনদিন বাঙালি রান্না না হলে প্রাণেশের মেজাজ সপ্তমে। প্রায় প্রতি রবিবার ফরমাস হয় ফুলকো লুচি আর সাদা আলুর তরকারির। এখানে পূজোর সময় ও ছুটি নেবেই। আমাকেও ছুটি নিতে হয়। গাড়ি নিয়ে আমরা এক মণ্ডপ থেকে আর এক মণ্ডপে ঘুরে বেড়াই। খিচুড়ি, লাবড়া, বেগুন ভাজা আর পায়েস খাই কব্জি ডুবিয়ে। বিজয়া দশমীর দিন ও আমাকে ঠেলে পাঠায়। এখানকার পূজো আমার ভাল লাগে না। ভাল লাগে না মহিলাদের শাড়ি গয়নার চাপা প্রতিযোগিতা। ভাল লাগে না কৃত্রিম ধুনুচী নাচ আর কলকাতা থেকে ভাড়া করে আনা পুরুতের সংক্ষিপ্ত পূজো। তবুও প্রতিবছর যাই। কেন কে জানে।

প্রাণেশ উত্তর কলকাতার ছেলে।হুল্লোড়ে, প্রাণবন্ত। যে কোনো পূজোতে গিয়ে ঢাক বাজাতে বসে যায়। উদ্দাম ধুনুচী নাচ নাচে। দরকার হলে ধুতি পান্জাবির ওপর বিশাল এপ্রন পরে পরিবেশন করতে লেগে যায়। আমি পারি না। ওর আঙুলের পলা গোমেদ দেখে কেউ কোন প্রশ্ন করলে তাকে গ্রহ নক্ষত্র পাথর ইত্যাদি নিয়ে লম্বা লেকচার দেয়। প্রাণেশ খুব জনপ্রিয় এখানে। আমার মেয়ে নিজে থেকে ঘাঘরা, লহেঙ্গা এমণ কি শাড়িও পরে নেয় নিজে থেকে। পূজোমণ্ডপে মহিলাদের সাথে বাঙলা বলে। নীলান্জন ওরফে কাটুম আর যায় না আমাদের সাথে। বলে ‘I can’t relate.’

আর আমি? আমি এইসব ক্লাবঘরে বসে মনে করি আমার ছোটবেলার পূজোর কথা। চার দিনের সেই টানটান উত্তেজনা। মা কাকিমা ঠাকুমার সাথে মণ্ডপে বসে মালা গাঁথা, চন্দন বাটা, নৈবিদ্য সাজানো। পূজোর চারদিন পাড়ায় কোনো বাড়িতে রান্না হত না। পাড়ার সবাই এক সঙ্গে খেত লম্বা টেবিলে বসে। আমা নুন লেবু জল দিতাম। পরিবেশন করা ছিল বাবা কাকাদের দায়িত্ব। তাঁরা বড় বড় বালতি নিয়ে কোমরে গামছা বেঁধে মহানন্দে ঐ অত লোক খাওয়াতেন।

বিজয়া দশমীর দিন বাড়ির সব মেয়ে বৌরা যেতেন মা দূর্গাকে বরণ করতে। ছোটো কাঁসার রেকাবিতে পান, সিঁদুর, বাড়িতে বানানো নারকোল নাড়ু, সন্দেশ, ধান দূর্বা। সধবারা বরণ শেষ হলে একে অন্যের কপালে সিঁদুর ছোয়াতেন। আধুনিক উদ্দাম সিঁদুর খেলাদেখিনি কখনো। ঠাকুমা প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে বলতেন সবাইকে ভাল রেখো মা। আগামী বছর তোমায় যেন আবার দেখে পাই। শক্তি দাও। শুভ হোক সবার।

এই কি শিকড়ের টান? এই অযৌক্তিক মোহ আর ভালবাসা? মন খারাপ হলেই রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, শক্তি, সুনীল, শঙ্খ ঘোষ? প্রতি বছর অসীম আগ্রহে পূজাবার্ষিকি সংগ্রহ করা লেখাপত্র যেমনই হোক? দূর বিদেশে আপ্রাণ চেষ্টা নিজের ভাষা, নিজের সংস্কৃতির কিছুটা পরবর্তি প্রজন্মকে দিয়ে যাওয়ার? যে শিকড় উপড়েছি স্বেছ্ছায় বা নিছক প্র্রয়োজনে তাকে যেন তেন প্রকারেণ বাঁচিয়ে রাখা? প্রতি বছর কলকাতা ফিরে সেই শিকড়ের সন্ধান রাস্তায় ফুচকা ঝালমুড়ি তেলেভাজা রোল; পার্ক স্ট্রিট, গড়িয়াহাট, একাডেমি, নন্দন, কলেজ স্ট্রিট, কফি হাউস; আমার জীর্ণ পুরোনো পাড়া, ঝাঁ চকচকে বহুতল অট্টালিকার দাপটে মুমূর্ষ। ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা ঠাণ্ডা নিঃশব্দ বহুতল মল আর আকাশপুলের ছায়ায় গুটিয়ে যাওয়া পুরোনো রাস্তাগুলো টের পাইয়ে দেয় আমার শহরের পরিবর্তন। শিকড় নেই আর। দ্রুত বদলে গেছে আমার শহর। তার অন্য রূপ এখন, অন্য ভাষা, অন্য সংস্কৃতি। বিশ্বায়ন সম্পূর্ণ এখানে, পদে পদে টের পাই ফিরে আসি যথন। বারবার, প্রতিবার। আমার শহর এক অচেনা জগৎ আজ। তবু কেন এত টান কে জানে!


দেবাশিস ভট্টাচার্য ‘শিবাজি’



আপন আমার রন্ধন
দেবাশিস ভট্টাচার্য ‘শিবাজি’

একটি জাতির কৃষ্টি, ট্র্যাডিশান গড়ে ওঠে যুগ যুগ ধরে, বহু প্রজন্মের একই ধরণের ব্যাবহারিক বৈশিষ্ট জোড়া লেগে লেগে সেই জাতির আইডেন্টিটি তৈরী হয় সেই সমাজের লোকেরা কি ভাষায় কথা বলে, কোন সামাজিকতার ছাঁচে নিজেদের ঢেলে নিয়েছে, কি খায়, কি পরে, এই সব কিছুই সেই জাতির নিজস্বতার অঙ্গ শিকড়ের টানে সেই দিকে চলতে গিয়ে দেখি আমার আমিত্বের একটা বড়ো জায়গা নিয়েছে আমাদের খাদ্যাভ্যাস আর সে তো শুধু পেট ভরানোর জন্যে নয় যখন কৃষ্টি বা ট্র্যাডিশানের দৃষ্টিতে দেখা যায় তখন তার একটা অন্য মাত্রাও চোখে পড়ে, যা আটপৌরে খাওয়াদাওয়ার অনেক উর্ধে সেটা নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয় খাদ্য তৈরীর পদ্ধতিটা কেবল দিন গুজরানের জন্যে রান্না করা নয় রন্ধন একটা শিল্প

বাঙালীর ঘরে জন্ম নিয়েছি বলেই হয়তো রান্নার শৈল্পিক দিকটা অনায়াসে ধরা দিয়েছে আমার কাছে আমার অস্তিত্ব জুড়ে এই শিল্পকলার অবদান ও আবেদন নিরন্তর, অমলিন...... অনবদ্য অমৃত রান্না যে একটা শিল্প সেইটার প্রথম পরিচয় ঘটেছে আটপৌরে দৈনন্দিন জীবননির্বাহের মাধ্যমে জীবনধারণের জন্যে যে খাওয়া দাওয়া, তার মধ্যেও যে কতো রকমফের, কতো ভাবনাচিন্তা, কতো প্রকল্পায়ন, তা না বোঝার বয়স অতিক্রম করে বোঝার বয়েসে আসতে আসতে কখন যে আমাকে আকর্ষিত করেছে, তা ঠাহর হয় না

যা কিছু নান্দনিক তা সবসময়েই আমাকে টানে সাধারণতঃ শিল্পকর্ম বলতে যা বোঝায়, যা মনে আসে, সেসব তো আছেই ছবি আঁকা, মূর্তি গড়া, টেরাকোটা, সূচীশিল্প অর্থাৎ সেলাই-ফোঁড়াই, গার্মেন্টস ডিজাইন আর টেইলারিং, উল-কাঁটায় সোয়েটারের নতুন নতুন ডিজাইন বোনা, বাটিক-বাঁধনি, কাটুম-কুটুম, আলপনা দেওয়া, ঘটে পটে আঁকা, গল্প বা কবিতার চিত্রবিন্যাস, কভার ডিজাইন, লোগো আঁকা, অরিগ্যামি, টেসেলেশান, ইকাবেনা-মরিবেনা, বাগান করা, ইন্টিরিয়ার ডিজাইন, বেতের আসবাবের ডিজাইন, কস্ট্যুম জুয়েলারি, কেশ বিন্যাস, কনে সাজানো, নাটকের বা নৃত্যশিল্পীর মেক-আপ করা, ফোটোগ্রাফি, তাদের নান্দনিক আবেদন দিয়ে সবাইকে আকর্ষণ করে, মন ভালো করে দেয়, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে উত্তেজিত করে, উদ্দীপ্ত করে এইসব শিল্পকলার সাথে রন্ধনশিল্পকেও আমি সমান আসনে দেখি এই সব শিল্পের প্রায় সবগুলোতেই আমি নিজে হাতে, নিজের অনুভব দিয়ে সৃজন করতে চেয়েছি, খানিকটা হয়তো সফলও হয়েছি হয়তো পুরষ্কার পাইনি কোনও, তবে আত্মীয় বন্ধুরা যখন তারিফ করেছে, ভালো বলেছে তখন আনন্দে যে মন ভরে গেছে, নতুন কিছু করার যে উৎসাহ পেয়েছি, তা স্বীকার না করে পারি? নন্দনকলার কোনও বিভাগেই আমার কোনও বিশেষ প্রশিক্ষণ নেই সবটাই চোখে দেখে, নিজের বোধে আর কেউ কিছু করছে দেখে দুএকটা কাজে কিছু সাহায্য অবশ্যই পেয়েছি অন্যদের কাছে দূর থেকে দেখে, কাছ থেকে দেখে, শেখার মন নিয়ে দুহাতে তুলে নেবার চেষ্টা করেছি নন্দনশিল্পের ভাণ্ডারের যা কিছু সুন্দর, মনোগ্রাহী, সৃজনশীলতার নিরিখে দুর্বার আবেদনময় উইন্ডো শপিঙে মনে মনে ঠাহর করে নিয়েছি গার্মেন্টসের কাটিং বাড়ী ফিরে খবরের কাগজ কেটে হাত পাকিয়ে তারপর কাপড় সেলাইকল নিয়ে বসে পড়েছি বানিয়ে নিয়েছি শিশুকন্যার জামা কাপড় এভাবেই চোখ কান খোলা রেখে এগিয়ে চলেছি মাথায় কোন কিছু গেড়ে বসলে তার শেষ না দেখে থামতে পারিনা, অবশ্যই নিজের হাতে করে সে যে কি আনন্দের

হ্যাঁ যে কথা দিয়ে শুরু করেছি তাতেই ফিরে আসতে চাই রন্ধনশিল্প রান্না করা ও পরিবেশন করাটা যে একটা আর্ট তা আগে বুঝতাম না তবে এই শিল্পে আকর্ষিত হবার মূলে আমার মায়ের হাতের অনবদ্য সব রান্নার পদ সেই সব পদের স্বাদ তো বটেই, গন্ধ আর দর্শনও আমার মনকে টেনে নিয়ে গেছে তার সৃজনের পশ্চাৎপটে আর সেই সময় থেকেই এই শিল্পকলার সাথে আমার আত্মিক পরিচয় ঘটতে থাকে

আমাদের ছোটবেলায় পরিবেশনটার অতো মাহাত্ম্য ছিলোনা আটপৌরে কাঁসার বাসনে, থালা-বাটি-গেলাসেই খাবার পরিবেশিত হতো খাগড়াই বাসনের সাথে কখনো সখনো ফুলকাটা, পাড়ে ঢেউতোলা বাটি বের হতো, জামবাটিতে বাবাকে পায়েস দেওয়া হতো আমার পছন্দের ছিলো একটা ভারী কানা-উঁচু থালা জলখাবারে চীনেবাসনের ব্যাবহার বা চলন ছিলো

চা নিয়ে চূড়ান্ত শৌখিনতা ছিলো আমাদের বাড়ীতে ফিনফিনে চায়ের পেয়ালা-পিরিচ হতে হবে, টীপটের ওপর মায়ের হাতের নকশী টীকোজীর জামা পরানো থাকবে কতক্ষণ, জলটা গরম কতটা হবে, দার্জিলিঙের মকাইবাড়ী, আসামের লামডিং, না কি অন্য কোনও বাগানের সুঘ্রাণী চাপাতা, ফ্লাওয়ারি অরেঞ্জ পিকো না কি ফার্স্ট ফ্লাশ, টীপটের ঢাকা খুলে কতবার চামচ নাড়িয়ে আবার ঢাকা ফিরিয়ে তারপরে চা ঢালা হবে সুগন্ধি চায়ে দুধের প্রবেশ নিষেধ সে ছিলো কড়া লিকারের আসামের চায়ের সঙ্গী, চিনির হাত ধরে এই সব খুঁটিনাটি দেখে শিখেছি বড়ো হতে হতে মণির শখের ফিনফিনে আদ্দির ধুতি পাঞ্জাবির সাথে ওঁর এই চায়ের সৌখিনতা বেশ মানানসই ছিলো দুধের চা বাবা আর সেজো কাকিমার পছন্দের ছিল, তাই বাবা বাড়ী ঢুকলেই কাকিমা চা করতে যেতেন, এক কাপ ওনার পছন্দের চাও হয়ে যেতো

আমার বাবাও দারুণ রান্না করতেন বাবা আর মায়ের genre  ছিলো আলাদা বাবার নিজস্বতা ছিল ভোগ রান্নায় আমাদের বাড়ীতে বারো মাসে তেরো পার্বণ, পুজো-আর্চা লেগেই থাকতো পৈতে হয়ে যাবার পরে আমাদের জোগাড়ে বামুনের ভূমিকায় নেওয়া হতো চালটা ধুয়ে দে, মুগডাল ভাজার সময়ে কড়াইতে একটু খুন্তি দিয়ে নাড়াচাড়া করে দে, কাটা সবজিগুলোয় জল ঢেলে দে, এইসব তবে এইসব করার আগে কোঁচা দিয়ে ধুতি পরাটা চাইই চাই, নচেৎ প্রবেশাধিকার নেই বাবা আমিষ পদও রাঁধতেন হাত চেটে খাবার মতো করে তবে সেগুলো প্রধানতঃ আটপৌরে হিসেবের বাইরে হাঁস, কাছিম, মুরগি, পায়রা, তিতির বাবার হাতে খেয়েছি আর রাঁধতেন বাবা পায়েস, কদাচিৎ, কিন্তু সেই স্বাদ এখনো যেন জিভে লেগে আছে কোলকাতায় ক্রিকেটের টেস্ট ম্যাচ হলে বাবা সকালে আলুসিদ্ধ, ডিমসিদ্ধ, ডালসিদ্ধ, কাঁচালঙ্কা আর ঝাঁঝালো সর্ষের তেল দিয়ে মেখে নিজে খেতেন আর আমাদের সব ভাইদের গরাস গরাস খাইয়ে দিতেন সে ছিলো হাতের যাদু অমন মাখা আমি নিজে এখনো রপ্ত করতে পারিনি

এ হেন বাড়ীতে বড়ো হয়েছি বলে ভালোমন্দ খাওয়াটা কোনও বিশেষ ঘটনা ছিলোনা, বরং নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিলো আর খেতে খেতে, দেখে শিখে বাঙ্গালীর রন্ধনরত্নের সিন্দুকের ঢাকাটা খুলে গেছে আমার বোধের সামনে ধন্য হয়েছি আমি আমার পরিবারে জন্মিয়ে তাই মনে রেখে লিখে ফেললাম এক বৃহদায়তন কাব্য, রাঁধন পূরাণ লিখেছিলাম –

মা ঢাকা বিক্রমপুরের, শ্রীহট্টী পিতৃকুল-
রকমারি খাবারের প্রকার প্রতুল,
জন্ম ও বিবাহসূত্রে বাঁধা কলিকাতা
‘হিন্দোল’-এ লিখতে ছড়া খুললেম খাতা

সেই ছোটবেলা থেকে যা খেয়েছি তাই
পঞ্চাশোর্ধে ভাবি বসে লিখে রাখা চাই
হারিয়ে যায় যে সবই কালের নিয়মে,
চটকদারী পিৎজা-পাস্তা, কে-এফ-সি’র ভ্রমে
এমতাবস্থায় যদি না লিখিয়া রাখি –
ইতিহাস কেন? নিজেরেই দিব ফাঁকি

স্মৃতি-রান্নাঘরে পাকে খাদ্য যেমন,
সেইমতো হবে তার সুপরিবেশন
নিরামিষ আমিষ পদের ছড়াছড়ি –
মিঠে, ঝাল, টক, নোনা – আছে রকমারি
স্বাদেও যে বলে তারা একে অন্যে দ্যাখো,
করিতে পরখ তাহে নিজে রেঁধে চাখো
নামের মাহাত্ম্য তাহে ভিন্নতা দেয় –
‘কষা’, ‘দোপিয়াজা’, ‘ঝোলে’ প্রতিভাত হয়

বাংলার রান্নার এই বৃহৎকথা থেকে কিঞ্চিৎ তুলে দিলাম এই অবসরে

হ্যাঁ, পুরানোকে ঠেলে দিয়ে নতুন সবসময়েই তার নিজের জায়গা করে নেয় সেটা রোধ করা যায়ও না, আবার করাটা বোধয় ঠিকও না কিন্তু তা বলে প্রাচীন, সাবেকী বা আটপৌরে বাংলার রান্নার যে ঐশ্বর্য আমাদের আছে, আর যা শৈল্পিক নৈপুণ্যে আর পাঁচটা কারুকলার থেকে কোন অংশে কম যায়না, তা কেন হারিয়ে যাবে? হারিয়ে যেতে আমি দিতে চাইনা তাই, এই শিল্পেও আমি নিজে করে, খেয়ে, শিখে, লিপিবদ্ধ করে রাখতে চাই যাতে উত্তরসূরী প্রজন্ম জানে যে রান্না, বিশেষতঃ বাঙালীর রান্না একটা শিল্প

কাটাকাটি, বাটাবাটি দিয়ে শুরু করে এক একটা রান্নার পদের সৃজন গুণবত্তার পারদর্শিতার মাপকাঠিতে ওজন করে রংরূপ স্বাদ-গন্ধের সঠিক সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশনে এই শিল্পে পূর্ণতা পায় কিন্তু খাওয়ায় এর গুণের প্রধান বিচার হয় স্বাদ যদি সব কিছুকে ছাপিয়ে যায়, রসনা তৃপ্ত হয়, তাহলেই এর সব থেকে বড়ো সার্থকতা কিন্তু লালশাক ভাজার ওপর যখন বড়ি বা চিনেবাদাম ভাজারা একটু নারকোল কোরার সাথে সেজে পরিবেশিত হয়, তখন কি মুখ দিয়ে ‘বাহ’ বেরিয়ে আসেনা? কলাপাতার মোড়ক খুলে ভাপা ইলিশের স্বর্ণালী আভা যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন সর্ষের ঝাঁঝে নাক খুলে যায়, চোখও বিস্মিত রংরূপের ছটায় সাদা সাদা ফুলকো লুচির পাশে কালোজিরে কাঁচালঙ্কার সাদা চচ্চড়ি আর পটলের দোলমা কাঁসার পদ্মকাটা থালায় সাজিয়ে দিলে কার বুকের পাটা আছে যে শিল্পকর্ম না বলে পারে? শ্বেতপাথরের গেলাসে বেলের পানা দিয়ে ওপরে সুন্দর একটা হাতে বোনা লেসের ঢাকনা দিলে ‘চমৎকার’ কথাটা তো আপনা আপনি বেরিয়ে আসবে, কি তাই না?

পৌষপার্বণে পিঠেপুলির রকমফের, অভিনবত্ব এবং চিরকালীনতা বাঙ্গালীর রন্ধনশিল্পের এক বিশেষ পরিচয়ের জায়গা আমাদের যৌথ পরিবারে সে ছিল এক সর্বৈব যৌথ প্রয়াস সবাই হাত লাগাতো সারারাতব্যাপী উৎসবায়োজনে সেটাও একটা সুযোগ ছিল হাতে কলমে রান্না শেখার সেই ছোট বয়সে 

এবারে আসছি আমি পার্বণী রান্নায়,
পৌষের পিঠে-পুলি ফিরে পেতে প্রাণ চায়
মনে পড়ে শৈশবে সংক্রান্তির দিনে
সারারাত কাটতো যে জেগে পিঠে রন্ধনে
পরিবারে যতোজন, জুটে যেতো সক্কলে,
ছোটরাও লেগে যেতো একটুকু ফাঁক পেলে
নারকোল কোরা কি বা পাটালির কুচি করা,
মাছ কি বা কচ্ছপ পুলির বদলে গড়া
দুধের পুলির সাথে চসিও বানানো হতো,
পিতলের হাঁড়ী ভরা পুলি পিঠে কতো শত
মুগ-পুলি গড়ে ভেজে, মিষ্টি আলুরও পুলি
গড়ে নিয়ে সযতনে নলেনের রসে ফেলি
রাতভর রাখা হতো নরমটি হবে বলে
ফুলে ফেঁপে উঠলেই তখন তা খাওয়া চলে
মা লেগে পড়তেন পাটিসাপ্টা গড়তেই
ক্ষীর ভরে, কোনটায় দিয়ে নারকোল ছেঁই
গোকুল পিঠেটি হতো চিনি সিরা ঘন করে,
ময়দা গোলায় খোয়াক্ষীরের পুরটি ভরে
মাটির ছাঁচ বাসনে হতো যে আস্কে পিঠে,
তার পাশে সরুচাকলি গরম তাওয়ায় ওঠে
এই দুই পিঠে খাওয়া নলেন পয়ড়া গুড়ে,
এ ছাড়া হাজারো পিঠে খাওয়া সারাদিন ধরে
  
এরপরেও মেনে নিতে কষ্ট যে রান্নাটা একটা শিল্প? নাঃ অনেকেরই হয়তো অসুবিধে হয় এটা নির্দ্বিধায় মেনে নিতে তা হোক, সেটা নিয়ে আমার কিছুই বলার নেই এটুকু বলতে পারি আমি সেই দলে নেই আমি যে এর শিল্পের স্বত্বাটাকে আন্দাজ করে নিয়েছি, চিনে নিতে পেরেছি তাই রন্ধন আমার বড়োই আপন আমার নিজের সার্বিক উন্মেষের একটা পথ রন্ধন আমার কাছে নতুন কিছু সৃষ্টি করার উৎসাহের জায়গা, আমার ক্লেশলাঘবের দিশারীও বটে  


DEBASISH BHATTACHARYA is a freelancer consulting Social Development Specialist, working in large-scale infrastructure development projects in India and abroad as well. An Anthropologist turned Regional Planner Debasish is fond of several activities from writing travelogues to cooking, from sketching, painting, photography to dress designing, embroidering to choreographing. Whenever he feels, in the early mornings or dead of nights, he sits with doing something creative that is so close to his heart.